পেশাদার ফটোগ্রাফার হওয়ার আকর্ষণীয় ৬টি পদক্ষেপ

Share with

শখ থেকে নিজের ব্যবসা দাঁড় করানো খুব সহজ কাজ নয়। একজন উচ্চাকাঙ্ক্ষী ফটোগ্রাফার হিসাবে তরুণ ফটোগ্রাফারদের মাথায় যে প্রশ্নটি সবসময় ঘুরপাক খায় তা হল, কিভাবে সফলভাবে ফটোগ্রাফি ব্যবসা শুরু করা যায়?

বেশিরভাগ মানুষের ধারণা একটি ভাল ক্যামেরা থাকলেই সাফল্যের সাথে ফটোগ্রাফি শুরু করা যায়। আসলে ফটোগ্রাফি এতটা সহজ নয়। চিত্রকলা বা সঙ্গীতের মত ফটোগ্রাফিও এক ধরণের সৃজনশীল শিল্প। শুধু ক্যামেরা সম্পর্কিত জ্ঞান তথা লাইট পর্যবেক্ষণ, ক্যামেরা কম্পোজিশন, রঙ তত্ত্ব, ছন্দ, নন্দনতত্ব এবং ছবির ফর্ম ঠিক করার কৌশল ভালভাবে জানলেও ফটোগ্রাফিতে সফল হওয়া যায় না। সাফল্যের জন্য প্রয়োজন আরও বিশেষ কিছু দক্ষতা। এই নিবন্ধে এমন ৬টি পরামর্শ আলোচনা করা হল, যা সাফল্যের সাথে আপনার ফটোগ্রাফি ব্যবসা শুরু করতে সহায়ক হবে।

১. ম্যানুয়াল মোডে ছবি তুলতে শিখুন

ম্যানুয়াল মোডে ছবি তুলতে জানা সব পেশাদার আলোকচিত্রীর প্রথম এবং প্রধান কাজ। আপনি নিজের মতো করে ক্যামেরা নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন এটা নিশ্চিত করা খুব জরুরী। ম্যানুয়াল মোডে ক্যামেরা চালাতে গেলে প্রথম প্রথম খুব কঠিন মনে হতে পারে, কিন্তু আপনি যখন সত্যিই ক্যামেরায় যথার্থ আলো নিয়ন্ত্রণ করে ছবি ক্যাপচার করার সঠিক উপায় বুঝে যাবেন তখন প্রতিটি ফ্রেমের উপর সম্পূর্ণ সৃজনশীল নিয়ন্ত্রণ নিতে পারবেন।

ভালো লাইটিং এবং ফোকাসিং শিখে গেলে অত্যন্ত জটিল আলোক পরিস্থিতিও ছবি তোলার উপযুক্ত করে নিতে পারবেন, যা ক্যামেরার অটো মোড করতে পারে না। ম্যানুয়াল মোড আলোকচিত্রীকে বাধ্য করে জানতে যে, তার লেন্সে ঠিক কী ঘটছে, যা একজন আলোকচিত্রীকে পরিপূর্ণ করে তোলে।

২. নিজের এবং নিজের কাজ সম্বন্ধে জানুন

পরবর্তী পদক্ষেপ হলো আপনার নিজস্ব স্টাইল ও কাজের ক্ষেত্র নির্ধারণ করা যা নান্দনিকভাবে আপনার ধ্যান ধারণার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এমন ভাবে নিজের ফটোগ্রাফি ক্ষেত্র খুঁজে বের করুন যা হবে আপনার প্রথম ও কাজ সূচনাকালীন পোর্টফোলিও। তবে মনে রাখতে হবে সময় পার হওয়ার সাথে সাথে আপনার কাজের ব্যপ্তি ও পরিপক্কতার উপর ভিত্তি করে পোর্টফোলিও প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হবে। তাই কি ধরণের ফটোগ্রাফি আপনার সবচেয়ে বেশি ভাল লাগে, সাথে সাথে তা আপনার ব্যক্তিত্বের সাথে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং কাজের তৃপ্তির জন্য আপনি ফটোগ্রাফিতে ঠিক কী তুলে ধরতে চান তা খুঁজে বের করুন।

এই কাজটি সবার আগে করতে হবে। নিজের ক্ষেত্র নির্ধারণ না করলে আপনি কোনো কাজেই তৃপ্তি খুঁজে পাবেন না। তবে ক্ষেত্র নির্ধারণ করার পর নিশ্চিত করতে হবে আপনি সম্পূর্ণ আত্মবিশ্বাসের সাথে এবং জেনে বুঝে কাজ করছেন। তবে সবচেয়ে ভালো হয় আপনি আজই ক্যামেরা নিয়ে বেরিয়ে পড়ুন আর কিছু বাস্তব ক্যামেরা অভিজ্ঞতা অর্জন করুন এবং নিজের কাজ নিয়ে প্রচুর গবেষণা করুন, যা আপনার আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি করতে সাহায্য করবে।

৩. ব্যবসা পরিকল্পনা তৈরি করুন

ফটোগ্রাফির জন্য ব্যবসার পরিকল্পনা তৈরি করা খুব সহজ। গুগল করে সহজ কোনো টেমপ্লেট নির্বাচন করুন, তারপর তা ডাউনলোড করুন আর নিজের তথ্য দিয়ে সাজিয়ে ফেলুন। আপনি চাইলে প্রাথমিকভাবে কাগজেও লিখে ফেলতে পারেন আপনার পরিকল্পনা। তবে যেভাবেই করুন না কেন নিশ্চিত করতে হবে যে, আপনি একটি ব্যবসা পরিকল্পনা করেছেন। কেননা যেকোনো ব্যবসায় পরিকল্পনার কোনো বিকল্প নেই, আর ফটোগ্রাফির মত জটিল পেশায় তো সবার আগে এটি বিবেচ্য। আপনার কাজের মানের ভিত্তিতে মূল্যনির্ধারণ আপনা থেকেই আপনার মুনাফা নির্ধারণ করবে।

প্রথম দিকে আপনি টিকে থাকার জন্য ন্যূনতম আয় নিশ্চিত করুন এবং সারা বছরের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারন করুন। এভাবে কাজ করলে নির্দিষ্ট সময়ে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সহজ হবে।

প্রত্যেক ব্যক্তি নিজের আর্থিক অবস্থার উপর ভিত্তি করে ব্যবসার প্রাথমিক তহবিল নিশ্চিত করে থাকে। তবে আর্থিক অবস্থার দোহায় দিয়ে বিক্ষিপ্তভাবে কাজ শুরু করা যাবে না। সফলভাবে ফটোগ্রাফি ব্যবসা শুরু করার জন্য একটি ন্যূনতম মূলধন নিশ্চিত করতে হবে, যা যাবতীয় সরঞ্জাম কেনার কাজে ও ব্যবসা পরিচালনার কাজে প্রয়োজন হবে। কখনও কখনও ক্লায়েন্টরা বুঝতে পারে না একটি ভাল ছবির কাজ সম্পূর্ণ করতে কী পরিমাণ শ্রম যায়। কিন্তু তাই বলে তাদের উপর ক্ষেপে গেলে চলবে না। মনে রাখতে হবে আপনার কাজের মধ্য দিয়ে আপনি সম্পূর্ণ ফটোগ্রাফিক সম্প্রদায়কে উপস্থাপন করছেন।

৪. সরঞ্জাম ক্রয় করুন

সরঞ্জাম কেনার ব্যাপারে সবসময় সুবিবেচক হতে হবে। স্টার্টআপ অবস্থায় অনেক বেশি সরঞ্জাম কিনে অর্থ নষ্ট করার কোন প্রয়োজন নেই। যদিও একটি ভালো ক্যামেরা বডি ও কয়েকটি লেন্স কিনতে কিছু টাকা খরচ করতেই হবে। পেশাদার ফটোগ্রাফাররা সবসময় ন্যূনতম একটি ক্যামেরা বডি সাথে রাখেন যা দিয়ে উচ্চ-রেজুলেশনের ছবি তোলা সম্ভব এবং সাথে দুই তিনটি বিভিন্ন ফোকাল লেন্সের লেন্স, একটি অতিরিক্ত ফ্ল্যাশ এবং একটি ট্রাইপড রাখুন।

মনে রাখবেন, লাইট এবং অন্যান্য স্টুডিও সরঞ্জাম ভাড়া পাওয়া যায়। এমনকি এখন স্টুডিও স্পেসও ভাড়া পাওয়া যায়। সুতরাং শুরুতে অতিরিক্ত সরঞ্জাম কেনার কোনো প্রয়োজন নেই। এতে আপনার ব্যবসায় লোকসান হতে পারে। ধৈর্য্য ধরুন, সময় পরিবর্তনের সাথে সাথে ব্যবসার অবস্থা বুঝে পর্যায়ক্রমে সবকিছু কিনে নিতে পারবেন।

৫. সঠিক পদ্ধতিতে মার্কেটিং করুন


পরবর্তী বিষয় হলো মার্কেটিং তথা বিপণন। অনেক ফটোগ্রাফার আছে যারা খুব ভাল কাজ করেন কিন্তু যথাযথ মার্কেটিংয়ের অভাবে ব্যবসায় ভাল করতে পারেন না। আপনি শুরুতে সাধারণ কিছু কাজ দিয়ে মার্কেটিং শুরু করতে পারেন। যেমন একটি ওয়েবসাইট তৈরি, সামাজিক যোগযোগ মাধ্যমগুলোতে প্রোফাইল বা পেজ তৈরি, আপনার কাজের পোর্টফোলিও ও ব্র্যান্ড লোগো ইত্যাদি।

যেহেতু আপনার একটি ব্যবসায় পরিকল্পনা আছে, সেহেতু সেই পরিকল্পনার আলোকে আপনি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি পর্যায়ে প্রচার চালাতে পারেন। তবে মনে রাখতে হবে শুধু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচারই যথেষ্ট নয়। কেননা আমরা তো সামাজিক মাধ্যমে রোজ অনেক ছবি দেখি, কিন্তু কয়টার কথা আমাদের মনে থাকে বা প্রয়োজনে কাদের আমরা খুঁজি? সুতরাং একটি ব্র্যান্ড লোগো ও নাম প্রচারের ক্ষেত্রে অবশ্যই গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করতে হবে।


৬. ধৈর্যশীলতা ও পেশাদারিত্ব


নিশ্চয়ই আপনি এখন নিজের ফটোগ্রাফি ব্যবসা শুরু করতে প্রস্তুত? উপরের বিষয়গুলো যদি নিশ্চিত করতে পারেন তবে অবশ্যই আজই শুরু করতে পারেন। তবে মনে রাখতে হবে বাইরে থেকে ফটোগ্রাফি যতটা চমৎকার আর মজার কাজ মনে হয়, বাস্তবে ঠিক তেমনটা নয়।

এখানে ধৈর্যশীলতা ও পেশাদারিত্ব সবার আগে। আপনি খুব ভালো ফটোগ্রাফার হতে পারেন, সেটা আপনার কাজের গুণগত মান কিন্তু সাফল্য পেতে সময় লাগবেই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top