আসছে অ্যাসিড বৃষ্টি

অ্যাসিড বৃষ্টি বর্তমান সময়ে প্রকৃতির ভারসাম্যহনীতার এক দৃষ্টান্ত। শিল্পোন্নত দেশগুলোতে আজকাল অ্যাসিড বৃষ্টি বেশি হচ্ছে। আর এই অ্যাসিড বৃষ্টি পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করছে। বিভিন্ন গাড়ির বিষাক্ত ধোঁয়া, কলকারখানার বর্জ্য—এসবের কারণে বায়ুমণ্ডলের ভারসাম্য হারাচ্ছে। আর এই ভারসাম্যহীনতাই সৃষ্টি করছে অ্যাসিড বৃষ্টি।

অ্যাসিড বৃষ্টি হলো বৃষ্টি বা অন্য কোনো ধরনের শিশির, যা বিশেষত অম্লধর্মী, অর্থাত্ এটি উঁচুমাত্রায় হাইড্রোজেন আয়ন ধারণ করে। স্বাভাবিক মাত্রার চেয়ে বেশি পরিমাণ নাইট্রিক ও সালফিউরিক অ্যাসিড-সংবলিত ভেজা ও শুকনো পদার্থের মিশ্রণ বাতাস থেকে ঝরে পড়ে। যেমন বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র এবং বিভিন্ন কারখানা থেকে সৃষ্ট অম্লীয় অক্সাইড বায়ুমণ্ডলের জলীয় বাষ্প ও অক্সিজেনের সঙ্গে বিক্রিয়া করে অম্ল­ উত্পন্ন করে। এই অম্ল­ ঐ অঞ্চলে বা দূরবর্তী কোনো স্থানে বৃষ্টির পানির সঙ্গে ঝরে পড়ে। এছাড়া কয়লা, পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাস পোড়ানোর ফলে বায়ুতে কার্বন ডাই-অক্সাইড বৃদ্ধি পায়। কয়লা পোড়ানোর ফলে এতে মিশে থাকা সালফার পুড়ে বায়ুতে সালফার অক্সাইড উৎপন্ন হয়। সালফার অক্সাইড বৃষ্টির পানিতে মিশে বৃষ্টির পানিকে অ্যাসিডযুক্ত করে, এই অ্যাসিডযুক্ত বৃষ্টিকেই অ্যাসিড বৃষ্টি বলা হয়।

এই বৃষ্টির অন্যতম কারণ মানুষের সৃষ্ট দূষণক্রিয়া! শিল্পকারখানাগুলো থেকে বায়ুতে মিশ্রিত হয় সালফার ডাই-অক্সাইড ও ফ্লোরাইড। অ্যাসিড বৃষ্টিতে বেশি অবদান রাখে সালফিউরিক অ্যাসিড! এই বৃষ্টি কার্বন ডাই-অক্সাইড, সালফার ডাই-অক্সাইড ও নাইট্রোজেন অক্সাইড নির্গমনের দ্বারা সংঘটিত হয়। এই পদার্থগুলো দূষণের জন্য যে সবচেয়ে বেশি দায়ী, সেই কারণ প্রথমে মধ্য ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে ধরা পড়ে। পরে এর প্রকোপ বেড়ে যায় জার্মান ও ইউরোপে। অ্যাসিড হলো অ্যাসিড বৃষ্টির প্রধান সংগঠক। ধন্যাত্মক বৈদ্যুতিক আধানযুক্ত হাইড্রোজেন আয়ন হলো অ্যাসিড। আয়নের ঘনত্বের ওপর অ্যাসিডের তীব্রতার মাপকাঠি নির্ভর করে। মাপকাঠি হিসেবে ব্যবহার করা হয় পিএইচ স্কেল। এই স্কেলের পরিধি সর্বনিম্ন ১ থেকে সর্বোচ্চ ১৪ দ্বারা সীমায়িত। স্কেলের কেন্দ্র বা মধ্যবর্তী সংখ্যা ৭ অ্যাসিড বা ক্ষারের ক্ষমতা নির্দেশ করে। পিএইচ স্কেলের নিম্নগতির ওপর নির্ভর করে কোনো মাধ্যমের অ্যাসিডের তীব্রতা নিরূপণ করা হয়। এই অ্যাসিডযুক্ত জলীয় বর্ষণই অ্যাসিড বৃষ্টি নামে পরিচিত।

অ্যাসিড বৃষ্টির জটিল ধরনের পরিবহন ও অপসারণ পদ্ধতির গবেষণা নিয়ে বিজ্ঞানীরা বেশ হিমশিম খাচ্ছেন। আপাতত তাদের চিন্তা ও মতবাদ সঠিক সিদ্বান্তে পৌঁছাতে সক্ষম হচ্ছে না। বিভিন্ন শক্তি উত্পাদক ও শিল্প কলকারখানায় ব্যবহূত জীবাশ্মঘটিত জ্বালানিই বায়ুমণ্ডলের সালফার ও নাইট্রোজেন অক্সাইডের প্রধান উত্স। তাপ উত্পাদক কারখানাগুলোতে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহূত হয় কয়লা ও তেল। এই জ্বালানি থেকে নির্গত ৬০ শতাংশ সালফার ডাই-অক্সাইড ও ৩০ শতাংশ নাইট্রোজেন অক্সাইড বায়ুমণ্ডলে মিশ্রিত হয়। বিভিন্ন ধরনের যানবাহন থেকেও এ ধরনের পদার্থ নির্গত হয়। ওজোনকে বর্তমানে বায়ুদূষণের অন্যতম প্রধান উত্স বলে ধারণা করা হচ্ছে। কারণ অ্যাসিড বৃষ্টি তৈরিতে ওজোনেরও একটি ভূমিকা রয়েছে। বায়ুমণ্ডলে সালফার ও নাইট্রোজেন অক্সাইডগুলো একটি জটিলতর প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে সালফিউরিক অ্যাসিড ও নাইট্রিক অ্যাসিডে পরিণত হয়। বায়ুমণ্ডলের ভৌত অবস্থায় কতখানি ওপরে বা নিচে অক্সাইডগুলো নির্গত হয়ে থাকে, তার ওপর ভিত্তি করে অ্যাসিড উত্পাদনের হার নির্ণীত হয়। এই অ্যাসিডের মাত্রা নির্ণয়ের জন্য অবলম্বন হিসেবে নেওয়া হয় দুাি জটিল রাসায়নিক কৌশল। এ দুটি হলো গ্যাস পর্যায় প্রক্রিয়া ও তরল পর্যায় প্রক্রিয়া। দুটিতেই সালফার ডাই-অক্সাইড ও নাইট্রোজেনের অক্সাইডগুলো যথাক্রমে সালফেট ও নাইট্রেটে পরিণত হয়। ম্যাঙ্গানিজঘটিত অনুঘটকই মেঘে অ্যাসিড বৃষ্টিকারী বিক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করে সরাসরি। বিজ্ঞানীরা বলেন, ওজোন কিংবা হাইড্রোজেন পার অক্সাইডের মতো জারনকারী পদার্থের উপস্থিতিতে এই অ্যাসিড বৃষ্টির কার্যক্রম দ্রুতগতিতে সংঘটিত হয়। এই অ্যাসিড বৃষ্টি পরিবেশের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলে। অ্যাসিড বৃষ্টি শুষ্ক বা আর্দ্র দুইভাবেই পৃথিবীর বুকে পতিত হতে পারে।

অ্যাসিড বৃষ্টি রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে স্থলজ, ইকোসিস্টেম জৈবিক পরিবেশ, মাটি, গাছপালা, মাছ, মানবস্বাস্থ্য প্রভৃতির ওপর মারাত্মক বিষক্রিয়ার সৃষ্টি করে। অ্যাসিড বৃষ্টির ক্ষয়কারী ধর্ম পরিবেশের ব্যাপক ক্ষতিসাধন করে। অ্যাসিড বৃষ্টির ক্ষয়কারী রাসায়নিক পদার্থের কারণে শহরের দালানকোঠার রং উঠে যেতে পারে। সেতুর মতো ইস্পাতের কাঠামো জারিত বা ক্ষয় হয়ে যেতে পারে এবং পাথরের মূর্তি বা ভাস্কর্য পুরোনো ও জরাজীর্ণ দেখা যেতে পারে। অন্যান্য রাসায়নিক উপাদানের সঙ্গে মিলে অ্যাসিড বৃষ্টির বাষ্প শহরে ধোঁয়াশার সৃষ্টি করে। ধোঁয়াশার কারণে শহরের মানুষের ফুঁসফুঁস ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং আয়ু কমে যায়। অ্যাসিডযুক্ত বৃষ্টি সব জীবের জন্য ক্ষতিকর। অ্যাসিড বৃষ্টির কারণে মাটিতে গাছের পুষ্টি উত্পাদনের পরিমাণ কমে যায়। গাছের বৃদ্ধি ব্যাহত হয়। হ্রদ ও জলাশয় মাছ ও অন্যান্য প্রাণীর বসবাসের অযোগ্য হয়ে ওঠে। পূর্বাঞ্চলীয় উত্তর আমেরিকা, জাপান, চীন, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও ইউরোপে অ্যাসিড বৃষ্টি বহু ক্ষতি করেছে। এক জরিপে দেখা যায়, কানাডায় প্রায় ৪০টি হ্রদ অ্যাসিড বৃষ্টির কারণে মাছশূন্য হয়ে গেছে। আরো ৪৮ হাজার হ্রদের নানান প্রজাতির মাছ আজ বিলুপ্তির পথে এই অ্যাসিড বৃষ্টির কারণেই।

অ্যাসিড বৃষ্টি কমানোর নানা রকম উপায় রয়েছে। ব্যক্তির নিজস্ব উদ্যোগ বা সামাজিক উদ্যোগে এই ব্যবস্থাগুলো নেওয়া সম্ভব। শুধু বাংলাদেশে নয়, গোটা বিশ্বে যেখানেই জনবসতি রয়েছে, সেখানে অ্যাসিডজাতীয় পদার্থের জড়ো হওয়া আটকানো বেশ সমস্যার কাজ। কিন্তু যদি তা করা যায়, তাহলে এক দিকে যেমন বিভিন্ন জীবজন্তু ও প্রাকৃতিক আবাসস্থল রক্ষা পাবে, তেমনি মানুষের তৈরি নান্দনিক কাঠামো স্থাপনাগুলো রক্ষা পাবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top
%d bloggers like this: