পদার্থবিজ্ঞানে মুসলিম বিজ্ঞানী হাসান ইবনে হাইসামের অবদান

আজকের এ বিশ্বকে যে সকল মুসলিম বিজ্ঞানী স্ব-স্ব অবদানের দ্বারা সমৃদ্ধ করে স্বরণীয়-বরণীয় হয়ে আছেন; হাসান ইবনে হাইসাম তাঁদের অন্যতম। তাঁর পুরো নাম আল হাসান ইবনে আল হাইসাম। কিন্তু তিনি পশ্চিমা বিশ্বে আল হাজেন নামেই সুপরিচিত। তিনি ছিলেন বিজ্ঞানের এক উজ্জল আলোকবর্তিকা। দৃষ্টিবিজ্ঞান, আলোকবিজ্ঞান এবং আলো সম্পর্কে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য।

ইসলামি সভ্যতার সোনালি যুগ ৯৬৫ খ্রিষ্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন বিজ্ঞানী ইবনুল হাইসাম। এ সোনালি যুগে জন্মগ্রহণ করে তিনি আলোকবিজ্ঞান, জ্যোতির্বিজ্ঞান, গণিত, আবহাওয়াবিজ্ঞান, দৃষ্টি সম্বন্ধীয় বিষয় এবং বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন।

বহুমুখী প্রতিভাধর এ বিজ্ঞানী বিভিন্ন বিষয়ে প্রায় দুইশত গ্রন্থ রচনা করেন। এর মধ্যে অন্যান্য বিষয় ছাড়া অংকে ৪১টি, জ্যামিতিতে ২৬টি এবং ইস্তাম্বুলের অধ্যাপক ইসমাইল পাশা’র তথ্য অনুযায়ী পদার্থবিদ্যায় ১১টি গ্রন্থ রচনা করেন। এছাড়াও বিভিন্ন লাইব্রেরিতে তাঁর ১৩টি পদার্থবিজ্ঞানের বই পাওয়া গেছে। পদার্থবিদ্যায় তাঁর রচিত গ্রন্থ তুলনামূলক কম হলেও আলোকবিজ্ঞানের উপর রচিত ‘কিতাবুল মানাজির’ তাঁকে বিশিষ্ট স্থান দান করেছে। যার জন্য মধ্যযুগের ইউরোপে তাঁকে দ্বিতীয় টলেমি কিংবা কেবল পদার্থবিদ নামে সম্মানিত করা হয়।

পদার্থ বিজ্ঞানের সব শাখাতেই ইবনুল হাইসামের অবদান রয়েছে। তবে আলোকবিজ্ঞানের অবদানই তাঁকে আজ স্বরণীয় করে রেখেছে। তিনি আলোর প্রতিফলন, প্রতিসরণ এবং এই প্রতিফলন-প্রতিসরণের ফলে সৃষ্ট নানাবিধ দৃষ্টি বিভ্রম ও মরীচিকা সম্মন্ধে বহু পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা প্রদান করেন। আলোর সম্মন্ধে টলেমির থিওরিকে তিনি ভুল প্রমাণ করে দেখান যে, এটি কেবল ক্ষুদ্র কোণের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, বৃহৎ কোণের বেলায় এটা খাটে না। ইবনুল হাইসামের মতে, একটি হালকা স্বচ্ছ মাধ্যম থেকে অপেক্ষাকৃত ভারী স্বচ্ছ মাধ্যমে প্রবেশ করার সময় আলোর যে দিক পরিবর্তন হয়, বিভিন্ন মাধ্যমে আলোর বেগের তারতম্যই তার কারণ।

ড. রাজী উদ্দিন সিদ্দিকীর মতে, বর্তমানে স্নেলের সূত্র নামে পরিচিত আলোর প্রতিফলন ও প্রতিসরণের নিয়ম ইবনুল হাইসাম আবিষ্কার করেন। তিনি আলোর আপতন ও প্রতিসরণ পথ এবং এই দুই মাধ্যমের অন্তর্বর্তী সমতলের উপর অঙ্কিত সরলরেখা একই সমতল ক্ষেত্রের উপর অবস্থিত এ পর্যন্ত আবিষ্কার করেন। এর পাঁচশত বছর পর লিডেন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক বিজ্ঞানী ডরষষবনৎড়ফ ঝহবষষ উক্ত দুই পথের কোণের মধ্যে যে একটি সম্পর্ক রয়েছে তা উদ্ভাবন করেন। এছাড়া তিনি একটি লেন্স কিভাবে ম্যাগনেফাইং হিসাবে কাজ করে তা পরীক্ষা করে দেখান। ক্যাটোপট্রিক্স সম্পর্কে তাঁর গবেষণা অষ-ঐধুবহ’ং ঢ়ৎড়নষবস নামে পরিচিত। বর্তমানে ইংরেজি খবহং শব্দটি ইবনুল হাইসামের আরবিতে ব্যবহৃত ‘আদাসা’ থেকে উদ্ভূত হয়েছে। ‘আদাসা’ অর্থ মসুরের ডাল, চোখের লেন্স মসুরের ডালের মতো। তাই ল্যাটিন অনুবাদকরা এই আদাসাকে খবহঃরপঁষঁসহ বলে অনুবাদ করেন। এই শব্দটি আজ খবহং নামে পরিচিত হচ্ছে।

পদার্থ বিদ্যার আলোর শাখায় তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ অবদান ‘কিতাবুল মানাজির’। এই গ্রন্থে তাঁর প্রস্তাবিত তাত্তি¡ক মতবাদ বিজ্ঞানে নতুন পথ খুলে দেয়। এতে তিনি প্রমাণ করার চেষ্টা করেন যে, চোখ থেকে আলোকরশ্মি বস্তুর উপরে পড়লেই সে বস্তুটা দেখা যায় না। বরং বস্তু থেকে আলো আমাদের চোখে এসে পড়লেই তবে সে বস্তু আমরা দেখতে পাই। তাঁর ‘কিতাবুল মানাজির’ গ্রন্থটি জিরার্ড ও উইটেলে কতৃক ল্যাটিনে অনূদিত হওয়ার ফলে এটি পড়ে তৎকালীন বহু পণ্ডিত অপটিকস বা আলোকবিজ্ঞানের প্রতি আকৃষ্ট হন। তাঁদের মধ্যে ফ্রান্সিস বেকন, রজার বেকন, লিউনার্দো দ্য ভিঞ্চি, পেকহাম, কেপলার, গ্যালিলিও গ্যালিলিই উল্লেখযোগ্য।

ইবনুল হাইসাম পিনহোল ক্যামেরা নামে একটি ক্যামেরা তৈরি করেছিলেন, যাকে পৃথিবীর প্রথম ক্যামেরা হিসাবে বিবেচনা করা হয়। এটি ছিল আলো নিরোধক একটি কাটের বাক্স। এর কোনো এক পৃষ্ঠে ছোট একটি ছিদ্র হতো, একটি পিন দিয়ে ছিদ্র করলে যতটুকু ছিদ্র হয় ঠিক ততটুকু। তাই এই ক্যামেরার নাম ছিল পিনহোল ক্যামেরা। বিভিন্ন গবেষণামূলক গ্রন্থ রচনা এবং অভিজাত ব্যক্তিদের শিক্ষা প্রদানের মাধ্যমে তিনি জীবিকা নির্বাহ করতেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top