বন্ধ্যাত্ব কোনো অভিশাপ নয়

সন্তান আল্লাহর দান। আল্লাহ যাকে খুশি তাকে সন্তান দান করেন এবং যাকে খুশি দান করেন না।সন্তান হওয়া একধরনের পরীক্ষা এবং সন্তান না হওয়া একধরনের পরীক্ষা। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘তিনি যাকে ইচ্ছা কন্যাসন্তান দেন, যাকে ইচ্ছা পুত্রসন্তান দেন। আবার কাউকে কন্যা ও পুত্রসন্তান উভয়টি দেন। যাকে ইচ্ছা তিনি বন্ধ্যা করেন। নিশ্চয়ই তিনি সব কিছু জানেন এবং সব কিছুতে সক্ষম। ’ (সুরা : আশ-শুরা, আয়াত : ৫০)

বহু মানুষ আছে, কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা আর বৃহদাকায় অট্টালিকা সবই আছে তাদের, কিন্তু তারা নিঃসন্তান। অজস্র অর্থ ব্যয় করেও সেসব দম্পতি মাতা-পিতা হওয়ার স্বপ্ন পূরণ করতে পারেনি। তাদের কাছে কাঁড়ি কাঁড়ি অর্থের চেয়েও একটি সন্তান অধিক মূল্যবান।

মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন নিঃসন্তান মাতা-পিতাকে এ দোয়া শিখিয়েছেন—‘রব্বি লা-তাযারনী ফারদাঁও ওয়া আন্তা খাইরুল্ ওয়ারিছীন্।অর্থাৎ হে আমার রব, আমাকে একা রেখো না। তুমি তো উত্তম উত্তরাধিকারী। ’ (সুরা : আম্বিয়া, আয়াত : ৮৯)

উল্লিখিত দোয়া সর্বপ্রথম উচ্চারণ করেছেন হজরত জাকারিয়া (আ.)। মহান আল্লাহ এ দোয়া এতই পছন্দ করেছেন যে তিনি তা কোরআনে উল্লেখ করেছেন।

বহু নবী নিঃসন্তান ছিলেন। হজরত জাকারিয়া (আ.) বার্ধক্য পর্যন্ত নিঃসন্তান ছিলেন। অন্যদিকে হজরত মরিয়ম (আ.) বায়তুল মোকাদ্দাসে তাঁর তত্ত্বাবধানে ছিলেন। একদিন তিনি দেখতে পেলেন আল্লাহ তাআলা ফলের মৌসুম ছাড়াই হজরত মরিয়ম (আ.)-কে ফল দিয়ে রিজিকের ব্যবস্থা করেছেন। তখন তাঁর মনে সন্তানের জন্য সুপ্ত আকাঙ্ক্ষা জেগে ওঠে। তাই তিনি আল্লাহর দরবারে বিশেষ দোয়া করেন। তিনি বলেন, ‘রাব্বি হাবলি মিল্লাদুনকা জুরিরয়্যাতান ত্বাইয়্যিবাতান, ইন্নাকা সামিউ’দ দুআ। অর্থাৎ হে আমাদের প্রতিপালক! আপনার পক্ষ থেকে আমাকে পূত-পবিত্র সন্তান দান করুন। নিশ্চয়ই আপনি প্রার্থনা কবুলকারী। ’ (সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ৩৮)

হজরত ইবরাহিম (আ.) একসময় নিঃসন্তান ছিলেন। তিনি আল্লাহর কাছে এ মর্মে দোয়া করেছেন—‘রব্বি হাবলি মিনাস সলেহিন অর্থাৎ হে আমার প্রভু! আমাকে সৎকর্মশীল সন্তান দান করো। ’ (সুরা : সাফফাত, আয়াত : ১০০) সুতরাং কোনো মানুষের কাছে সন্তান কামনা করা যাবে না। সন্তান লাভের জন্য অবৈধ ও অনৈসলামিক উপায় অবলম্বন করা যাবে না। নিঃসন্তান দম্পতির উচিত, আল্লাহর ওপর ভরসা করে উল্লিখিত দোয়া পাঠ করা।

আল্লাহর খাঁটি বান্দাদের পরিচয় দিয়ে কোরআনে বলা হয়েছে, তাঁরা নেক স্ত্রী ও সন্তানের জন্য দোয়া করেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘রব্বানা-হাবলানা-মিন্ আয্ওয়াজ্বিনা ওয়া যুররিয়্যা-তিনা কুর্রতা আ’ইয়ুন ওয়া জা’আল্না-লিল মুত্তাকীনা ইমামা। অর্থাৎ হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততিদের আমাদের জন্য নয়ন প্রীতিকর করো এবং আমাদের সংযমীদের আদর্শস্বরূপ করো। ’ (সুরা : ফুরকান, আয়াত : ৭৪)

আমাদের দেশের বহু নর-নারী নিঃসন্তান বা বন্ধ্যত্বের কারণে হীনম্মন্যতায় ভোগে। সাধারণত দুই বছর বা এর অধিক সময় কোনো ধরনের জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি ছাড়া গর্ভধারণে ব্যর্থ হলে তাকে ডাক্তারি ভাষায় বন্ধ্যত্ব বলা হয়। প্রতি ১০০ জন দম্পতির মধ্যে ৮৪ জন প্রথম বছরে এবং ৯২ জন দ্বিতীয় বছরের মধ্যে গর্ভধারণ করতে সমর্থ হন। তাই বলা যায়, প্রতি ১০০ জন দম্পতির মধ্যে আটজন বন্ধ্যত্বের শিকার হন।

বন্ধ্যত্বের বহুবিধ কারণ থাকে। স্বামী বা স্ত্রীর কোনো একজন বা উভয়ের ক্ষেত্রে সমস্যা থাকতে পারে। তা ছাড়া গর্ভধারণের জন্য দরকার একটি সুস্থ ওভাম (ডিম্বাণু), সবল বীর্য ও নরমাল ইউটেরাস বা জরায়ু। এর যেকোনো জায়গায় সমস্যা হলে গর্ভধারণে ব্যর্থতা দেখা দিতে পারে।

অনেক ভাই জানতে চান, যারা আল্লাহর কাছে অনেক চাওয়ার পরও সন্তান হচ্ছে না, তাদের ব্যাপারে কী বলব? আসলে কোনো নারী বা পুরুষকে নিঃসন্তান হওয়ার কারণে আঁড় চোখে দেখা বা তাদের সম্পর্কে খারাপ ধারণা পোষণ করা উচিত নয়। কোনো দম্পতির সন্তান না হলে সেটা যেমন তাদের নিজেদের কৃত ভুলের (গর্ভপাত, হারাম জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি গ্রহণ ইত্যাদি) কারণে হতে পারে, আবার আল্লাহর পক্ষ থেকে দেওয়া পরীক্ষাও হতে পারে, আমরা অবশ্যই সবাইকে এক পাল্লায় মাপতে পারি না।

মহান আল্লাহ যুগে যুগে তাঁর বহু নৈকট্যশীল বান্দাকে সন্তান নামক নিয়ামত না দিয়েও পরীক্ষা করেছেন, তাঁরা যথারীতি উত্তীর্ণও হয়েছেন। হজরত জাকারিয়া আলাইহিস সালামের স্ত্রী বন্ধ্যা ছিলেন, অনেক ধৈর্য ও দোয়ার পর মহান আল্লাহ শেষ বয়সে একজন সন্তানের সুসংবাদ দিয়েছিলেন। আছিয়া আলাইহিস সালাম নিঃসন্তান ছিলেন। আইয়ুব আলাইহিস সালামকে অনেক সন্তান-সন্ততি দিয়ে আবার তাদের কেড়ে নিয়ে পরীক্ষা করা হয়েছিল। ইবরাহিম আলাইহিস সালামের জীবনী থেকে জানা যায়, তাঁদেরও অনেক বছর নিঃসন্তান রাখা হয়েছিল।

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর দুই কিংবা তিনজন স্ত্রী বাদে আর কারোই সন্তান ছিল না। উম্মুল মুমিনীন আয়েশা (রা.) নিজেই নিঃসন্তান ছিলেন। এমন ভূরি ভূরি উদাহরণ পাওয়া যাবে। তাই সন্তান না হলে হতাশ হওয়ার কারণ নেই। আর বিনা কারণে কারো সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা পোষণ করা গোনাহের কাজ। কেননা মহান আল্লাহ কাউকে সন্তান দিয়ে পরীক্ষা করেন, আবার কাউকে না দিয়ে। আসলে মুমিনের গোটা জীবনই পরীক্ষা। ধৈর্য, ইস্তিগফার ও দোয়ার মাধ্যমে আমরা এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top