করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে করণীয়।

করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে করণীয়: ০১

প্রথমেই আমরা একটি কথা খুবই গুরুত্ব দিয়ে শুনে নিই। সেটা হলো, এই বৈশ্বিক মহামারি করোনা ভাইরাস সম্পর্কে একেবারে অথনেটিক সোর্স ছাড়া অন্যকোনো মাধ্যম থেকে জানা তথ্য ভুলেও প্রচার করব না। এতে ব্যপকভাবে গুজব ছাড়ানোর আশঙ্কা আছে। আর তাতে ক্ষতির পরিমাণ অকল্পনীয়ভাবে বেড়ে যেতে পারে। ইতোমধ্যেই বেশকিছু গুজব ছড়িয়েছেও। অথনেটিক সোর্স হিসেবে WHO-এর অফিসিয়াল ওয়েবসাইট ফলো করতে পারি।

ইতোমধ্যে শুরু হওয়া কিছু গুজব-

ক. তাপমাত্রা বেশি থাকায় করোনা আক্রমণ করবে না। এটা ভুল। ভাইরাসটি ৬০-৭০ ডিগ্রি তাপমাত্রার নীচে মারা যায় না।

খ. তিনটি থানকুনি পাতা খাওয়া।

গ. ভারতে গোমূত্র ও গোবরের ব্যবহার।

করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে করণীয়: ০২

প্রশ্ন: মাস্ক পরলে কি করোনা ভাইরাস থেকে বাঁচতে পারব?

উত্তর: না। মাস্ক করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে সক্ষম নয়।

এই তথ্যটি বাংলার মাস্ক ব্যবসায়ী ও হুজুগে মাস্কওয়ালাদের জেনে রাখা দরকার যে— সাধারণেরা মাস্ক পরলে ধুলাবালি ও অন্যান্য জীবাণু থেকে বেঁচে থাকবে। করোনা থেকে নয়। তাই এটার ওপর আস্থা না রেখে অন্যান্য করণীয়গুলোতে ফোকাস দিন। তবে আক্রান্ত ব্যক্তি, সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্যকর্মী ও ডাক্তারদের জন্য মাস্ক পরা জরুরি।

একটি ক্লিনিক্যাল মাস্ক একবারের বেশি ইউজ করা যাবে না। সেটাকে হাত দিয়ে ধরলে বা নাড়াচাড়া করলে সেটাতে হাত থেকে জীবাণু লেগে যায়। তাই হাত দিয়ে ধরা যাবে না। খুলে পকেটে রেখেও পুনরায় ইউজ করা যাবে না। ফেলে দিতে হবে। আর সেটা হতে হবে কোনো ঢাকনাযুক্ত পাত্রে।

কাপড়ের মাস্ক ইউজ করলে প্রতিবার হাত দিয়ে ধরার বা পকেটে রাখার পর ভালোভাবে সাবান দিয়ে ধুয়ে রোদে শুকিয়ে পুনরায় ইউজ করা যাবে।

করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে করণীয়: ০৩

প্রশ্ন: করোনা কি বাতাসে ছড়ায়? বা কীভাবে ছড়ায় এটা? আর এর থেকে বাঁচতে সবচেয়ে জরুরি করণীয় কী?

উত্তর: না। বাতাসে ছড়ায় না। ভাইরাসটি মূলত হাঁচি-কাশির মাধ্যমেই আক্রান্ত ব্যক্তি থেকে ছড়িয়ে থাকে। হাঁচি-কাশির সাথে যে ড্রপলেট [থুথুর বিন্দু] আসে তাতে ভর করে ভাইরাসটি বেরিয়ে আসে। এবং যতদূর এই ড্রপলেট যায় ঠিক যতদূরই ভাইরাসটি যায়। ভাইরাসটি এই ড্রপলেট ছাড়া একা একা বাতাসে ভাসতে পারে না।

যেখানে সেটা লাগে সেখানেই ভাইরাসটি লেগে স্থির হয়ে থাকে। এরপর কেউ এর সংস্পর্শে এলে সে সংক্রামিত হয়। সংক্রামিত স্থান/অংশ অন্য কেউ স্পর্শ করলে সেখানেও সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে। প্রাণীদেহ থেকে বেরিয়ে আসার পর সর্বোচ্চ ৪/৫ ঘণ্টা ভাইরাসটি বেঁচে থাকতে পারে।

করোনা ভাইরাস থেকে বাঁচতে সবচেয়ে জরুরি যেটা প্রয়োজন সেটা হলো— বাইরে বের হলে ভুলেও নাকে-চোখে-মুখে হাত দেয়া যাবে না। কারো সাথে হ্যান্ডশেক ও স্পর্শ থেকে বিরত থাকতে হবে। ঘরে ফিরে কাউকে স্পর্শের আগে ও কাছে যাওয়ার আগে সর্বপ্রথম দুই হাত মিনিমাম ২০ সেকেন্ড সময় নিয়ে ভালোভাবে ধুতে হবে। এর চেয়ে কম সময়ে হলে জীবাণু মরে না। হাঁচি-কাশির ড্রপলেট কাপড়ে বা অন্যকোথাও লাগলে সেটাও ধুয়ে নিতে হবে। ঘনঘন এই হাত ধোয়াটাই সেইভ থাকার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। কাজেই হাত ধোবেন। খাওয়ার আগে-পরে, টয়লেট থেকে এসে, বাচ্চাকে খাওয়ানোর আগে-পরে, রান্নার আগে-পরে, বাইরে থেকে এসে এবং হাতে কোনো ময়লা লাগলে। আর একান্তই জরুরি না হলে ঘর থেকে বের হবেন না। সেইভ থাকার জন্য সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য যেটা দেবেন সেটা হলো— আল্লাহর কাছে এই আযাব থেকে রক্ষা পেতে তওবা-ইস্তেগফার করা। খুব দু’আ করা। গুনাহ থেকে বাঁচা।

আর ব্যবসায়ী ভাইয়েরা পণ্যদ্রব্যের মূল্য বাড়ানো থেকে বিরত থাকবেন। সুযোগ পেয়ে কসাই বনে যাওয়া একপ্রকার জুলুম। এই জুলুমের কারণে আপনিও রবের এই আযাবে ধরাশায়ী হতে পারেন।

করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে করণীয়: ০৪

ব্যবসায়ী ভাইয়েরা! সুযোগ পেয়ে কসাই বনে যাবেন না! এটা মারাত্মক জুলুম! সদাই-পাতি কিনতে গেলে কারো দীর্ঘশ্বাস বের হলে করোনা আপনাকে ধরুক বা না ধরুক— সেই দীর্ঘশ্বাস কিন্তু আপনাকে খালাস করে দেবে। তাছাড়া রবের নারাজির কারণে সমূহ সম্ভাবনা আছে যে— আপনি করোনাতেও আক্রান্ত হবেন। তাই জালেমের রূপে না এসে বন্ধু হয়ে যান। পাশে দাঁড়ান। ব্যথিত হোন। সামর্থ থাকলে গরিবদের ফ্রি-তে কিছু দিন। আল্লাহ বারাকাহ দিবেন। তাছাড়া এই সদাকার কল্যাণে উদ্ভূত মহামারি থেকে বেঁচেও যেতে পারেন। মনে রাখবেন, সকল সতর্কতার ঊর্ধ্বে— রব যদি কাউকে বাঁচিয়ে নেন, সে বেঁচে যাবে। অন্যথায় সকলেই নিরুপায়।

করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে করণীয়: ০৫

প্রশ্ন: কীভাবে বুঝব আমায় করোনা সংক্রমণ হয়েছে এবং কখন হাসপাতালে যাব?

উত্তর: শুষ্ক কাশি, জ্বর এবং শ্বাসকষ্ট। এই তিনটি লক্ষণ যদি আপনার থাকে তাহলে এখনই সতর্ক হোন৷ এবং বাড়িতে কমপক্ষে ৩ ফিট দূরত্ব বজায় রেখে হোম কোয়ারেন্টাইন করুন ১৪ দিন। আপনি আক্রান্ত হয়ে থাকলে এর মধ্যেই তিনটি লক্ষণ ধীরেধীরে বাড়তে থাকবে। বাড়তে থাকলে ঠিক তখনই সরাসরি হাসপাতালে রেফার হবেন। সাধারণ সর্দি-জ্বর ও কাশিতে ভয় পাবেন না। কারণ এমনিতেই এখন সিজনাল চেঞ্জিং টাইম। শীত থেকে গরম আসছে। এসময় নরমাল সর্দি-জ্বর ও কাশি অনেকেরই হয়।

তাই অহেতুক হাসপাতালে ভীড় জমাবেন না। সাধারণ সর্দি-জ্বর ও কাশিতে এবং নিজে নিজে হোম কোয়ারেন্টাইন করার সময় সর্দি-জ্বর ও কাশি থাকলে—

  • জ্বরের জন্য Tab. Napa ৬ ঘণ্টা পরপর একটা করে ভরাপেটে খাবেন৷ দিনে ৪ টা (জ্বরের প্রকোপ বেশি হলে)।
  • সর্দিকাশি হলে Tab. Fenadin-120 রাতে একটি করে ভরাপেটে খাবেন। সাথে একটি কাশির সিরাপ খেতে পারেন।
  • কাশি ও শ্বাসকষ্ট থাকলে Tab. Montair-10 রাতে ১টা করে খেতে পারেন।

এই হলো প্রাথমিক চিকিৎসা। এরসাথে গরম পানি খাবেন, আদা দিয়ে লাল চা খাবেন, ভিটামিন-সি জাতিয় খাবার বেশি খাবেন, পানি বেশি খাবেন, সকালের রোদ গায়ে মাখবেন, ঠাণ্ডা সবকিছু এড়িয়ে চলবেন। এগুলোতে যদি না সারে, এবং উপরের তিনটি লক্ষণ যদি বাড়তে থাকে তাহলে দ্রুত হাসপাতালে যাবেন। ক্লিয়ার?

প্রশ্নঃ করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হলে মৃত্যুর আশঙ্কাই-বা কতটুকু?

উত্তর: আপনি যদি প্রবাসী না হোন কিংবা প্রবাসী কারো সংস্পর্শে ১৪ দিনের মধ্যে না গিয়ে থাকেন তাহলে আপনি অনেকটা নিরাপদ। করোনা প্রতিরোধে উপরের টিপস গুলো ফলো করলে আপনি আরো বেশি নিরাপদ।

এতকিছুর পরও যদি আক্রান্ত হয়েই পড়েন, এবং আপনার বয়স যদি ৪০ এর নিচে হয়—আপনি এখানেও অনেকটা নিরাপদ। আবার আপনি যদি নারী হোন, সেক্ষেত্রে আপনি আরও বেশি নিরাপদ।

শুধুমাত্র বয়স্করা এবং যাদের অন্যান্য বড় ধরণের রোগ আছে তারা একটু ঝুঁকিতে আছে। বাকিদের মৃত্যু ঝুঁকি তুলনামূলক খুবই কম। সবচেয়ে বড় কথা হলো—এই পর্যন্ত আক্রান্তদের অধিকাংশই সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে গেছে। বাকিরা এখনও চিকিৎসাধীন। এর মাঝে যারা মারা যাচ্ছে—তাদের অধিকাংশই বয়স্ক পুরুষ এবং অন্যান্যরা বড় বড় রোগে ভুগছেন। নারীদের আক্রান্ত এবং মৃত্যু হার পুরুষদের তুলনায় অনেক কম।

কাজেই— করোনা হলেই আপনি শেষ, এই ধারণা ছুড়ে ফেলুন। মানসিকভাবে শক্ত থাকুন। টিপসগুলো ফলো করুন। আল্লাহ ভরসা। শুধুশুধু আতঙ্কিত হয়ে ব্যবসায়ীদের পকেট গরম করবেন না। নিজের পকেটও খালি করবেন না। আর দেশেরও ১২টা বাজাবেন না। সবশেষে এটাই বলব: আমরা চিন্তিত হব, সতর্ক হব; কিন্তু আতঙ্কিত হব না।

তথ্য সূত্রঃ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।

লেখকঃ জাফর বিপি।

Leave a Reply

Back to top