in

যেসব দেশি ফলের চিত্র পাল্টে দিলো বিদেশি প্রজাতি

বাংলাদেশ ফল উৎপাদনে গত এক দশকে ব্যাপকভাবে এগিয়েছে এবং উৎপাদন হচ্ছে প্রায় ১ কোটি ২২ লাখ টন ফল।

তবে ফলের বাজারে ব্যাপক অবদান আছে আমের এবং প্রতিনিয়ত বিজ্ঞানীরা নতুন নতুন জাতের উদ্ভাবন করে আমের উৎপাদন বাড়াতে ভূমিকা রাখছেন।

কিন্তু কিছু ফল আছে যেগুলোর ব্যাপক বিস্তার হয়েছে মূলত বিদেশি প্রজাতির মাধ্যমে।

শস্য উৎপাদন বিশেষজ্ঞ ড. মোঃ দেলোয়ার হোসেন মজুমদার বলছেন, পেয়ারা, পেঁপে, নারিকেল, গাবের মতো ফলগুলোর ব্যাপক উৎপাদন বাড়ছে বিদেশি প্রজাতির কারণে।

বিশেষ করে পেয়ারা ও পেঁপে – এ ফল দুটির এখন ব্যাপক উৎপাদন হচ্ছে ও প্রায় সারাবছরই কাঁচা ও পাকা আকারে এ ফল দুটি পাওয়া যায় এবং দাম তুলনামূলক অন্য ফলের চেয়ে কম বলে সাধারণ মানুষের পুষ্টির একটি সহজলভ্য উৎসে পরিণত হয়েছে।

কাজী পেয়ারা থেকে থাই পেয়ারা
সরকারের কৃষি তথ্য সার্ভিস বলছে পেয়ারা উৎপাদনের দিক দিয়ে ২০১১ সালের তথ্য মতে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান ৮ম।

দক্ষিণাঞ্চলের পিরোজপুর জেলার স্বরূপকাঠি, চট্টগ্রাম জেলার কাঞ্চন নগর, ব্রাক্ষণবাড়িয়া জেলার মুকুন্দপুরসহ কিছু এলাকা পেয়ারা চাষের জন্য সুপরিচিত।

কৃষি গবেষণা ইন্সটিটিউট এর পাহাড়ি কৃষি গবেষণা কেন্দ্র, রাইখালী সম্প্রতি একটি চমকপ্রদ পেয়ারার জাত উদ্ভাবন করেছে, যা সম্পূর্ণ বীজমুক্ত।

ড. মোঃ দেলোয়ার হোসেন মজুমদার বলছেন, ডঃ কাজী বদরুদ্দোজার হাত ধরে প্রথম এসেছিলো কাজী পেয়ারা, যেটি তিনি চালু করেছিলেন বাংলাদেশে আশির দশকে।

“কিন্তু কাজী পেয়ারার জায়গায় এখন ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে থাই পেয়ারা। কারণ এটি খেতে নরম ও বেশী সুস্বাদু। ২০০০ সালের পরে এই থাই পেয়ারা এসে এখন একাই বাজার দখল করে নিয়েছে,” বলছিলেন এই গবেষক।

থাই ও তাইওয়ানী জাতের পেঁপে জনপ্রিয় বাণিজ্যিক চাষে
বাংলাদেশের গ্রামগঞ্জে যে কোনো বাড়িতে পেয়ারা গাছ যেমন দেখা যায় তেমনি চোখে পড়ে পেঁপে গাছও। কাঁচা ও পাকা উভয়ভাবে খাওয়ার জন্যই পেঁপের জনপ্রিয়তা অনেক।

দেশীয় নানা জাতের পাশাপাশি বিদেশি প্রজাতির পেঁপে এর ব্যাপক উৎপাদনে ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করেন মিস্টার মজুমদার।

তবে পাহাড়ি এলাকায় সাম্প্রতিক সময়ে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে পেঁপের উচ্চ ফলনশীল একটি জাত- এর নাম তাইওয়ানের রেড লেডি পেঁপে।

মূলত রোগ বালাইয়ের প্রবণতা কম থাকার পাশাপাশি অল্প সময়ে বেশি ফলনের কারণে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে এ জাতের পেঁপে।

এছাড়া থাই জাতের হল্যান্ড গোল্ড পেঁপে সারা বছর চাষ করা যায় বলে দেশজুড়ে ব্যাপকভাবে সমাদৃত।

দেশি অনেকগুলো জাত থেকেও বেশ ভালো ফল পাচ্ছেন চাষিরা।

ভিয়েতনামী নারিকেল:
বাংলাদেশের প্রায় সর্বত্র বিশেষ করে দক্ষিণাঞ্চলে ও পশ্চিমাঞ্চলে নারিকেল প্রায় সব বাড়িতেই দেখা যায়। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে ভিয়েতনাম থেকে আসা নারিকেল গাছ নিয়ে ব্যাপক উৎসাহ দেখা যাচ্ছে।

ডঃ দেলোয়ার হোসেন বলছেন দুই বা তিন বছরের মধ্যেই ফল পাওয়া যায় বলে ক্রমশ জনপ্রিয় হচ্ছে ভিয়েতনামী নারিকেল।

অন্যদিকে বাংলাদেশের সনাতন যে জাতের নারিকেল গাছ তা থেকে ফল পেতে ৭/৮ বছর সময় লাগে।

সেজন্য ভিয়েতনামের উচ্চ ফলনশীল এ নারিকেলে জাত দ্রুত জনপ্রিয় হচ্ছে। এর এক একটি গাছ থেকে বছরে দুশোর বেশি নারিকেল পাওয়া সম্ভব।

আসছে কাঁঠাল, গাবসহ আর কিছু ফলের বিদেশি প্রজাতি

ডঃ দেলোয়ার হোসেন জানান দেশীয় কাঁঠাল একটু আঠালো ধরণের হয় সেজন্য অনেকেই খেতে চায়না।

তাই এখন ভিয়েতনামের একটি কাঁঠালের জাত এসেছে যেটিতে এ সমস্যা নেই এবং এক একটি কাঁঠাল ৩/৪ কেজি ওজনের হয় যার ভেতরটা লাল ও সবুজে মিশ্রণ।

আবার গাবের মতো একবারেই দেশীয় ফল যেটি এখন আর খুব বেশি দেখা যায়না সেটিও আবার ফেরত আসতে যাচ্ছে বিদেশি প্রজাতির হাত ধরে।

থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনাম থেকে গাবের জাত আসছে যেগুলো উচ্চ ফলনশীল ও বেশ সুস্বাদু বলে অনেকেই আগ্রহী হয়ে উঠছেন।

ফলন বাড়িয়েছে বিদেশি প্রজাতি

সরকারি হিসেবেই গত ১০ বছরে দেশে আমের উৎপাদন দ্বিগুণ, পেয়ারা দ্বিগুণের বেশি, পেঁপে আড়াই গুণ এবং লিচু উৎপাদন ৫০ শতাংশ বেড়েছে।

মূলত বিদেশি প্রজাতির হাত ধরেই পেয়ারা ও পেঁপের উৎপাদন এতো বেড়েছে।

আবার আমের বেশিরভাগ জাত বাংলাদেশের নিজস্ব হলেও ইন্দোনেশিয়া ও অস্ট্রেলিয়ান কিছু জাত বছর জুড়েই উৎপাদন হয় বলে বারোমাসি হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, এক যুগ আগেও দেশে ৫৬ প্রজাতির ফলের চাষ হতো। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর হিসেবে বর্তমানে ৭২ প্রজাতির ফল চাষ হচ্ছে। আরও ১২ প্রজাতির ফল বাংলাদেশের চাষ উপযোগী করার জন্য গবেষণা চলছে।

যদিও গবেষকরা দাবি করেন যে ১৩০ প্রজাতির ফল জন্মে বাংলাদেশে।

এর মধ্যে নিয়মিত চাষাবাদ হয় অন্তত ৭০ টি ফলের।

Leave a Reply

ধর্মীয় স্বতন্ত্রতা, স্বকীয়তা ও পরিমিতিবোধ

হৃদয়ে অমর হোক, ভাস্কর্যে নয়