in , , ,

লেবু ও লেবুপাতার উপকারিতা এবং কিছু ক্ষতিকর প্রভাব

সাধারণত আমরা প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায় লেবু রাখি। ভিটামিন সি সমৃদ্ধ লেবু শরীরের জন্য খুবই উপকারী। এতে আরো রয়েছে বিভিন্ন খনিজ উপাদানসমূহ। যা ঠাণ্ডা-জ্বর জাতীয় রোগের বিরুদ্ধে ভীষণ কার্যকর।

এই গরমে যখন তীব্র দাবদাহে ক্লান্ত, ঠিক তখনই এক গ্লাস লেবুর শরবত হলে প্রাণটা জুরিয়ে যায়। শুধু শরবত হিসেবেই নয়, ওজন কমাতেও অনেকেই সকালে লেবুর শরবত খান। কিন্তু জানেন কি লেবুর শরবত শুধু ওজন কমানো নয়, আরও অনেক উপকার পাচ্ছেন আপনি? রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানো থেকে শুরু করে পেট পরিষ্কার রাখার মতো প্রচুর উপকার করে লেবু। তো জেনে নেয়া যাক লেবুর অসাধারণ কিছু উপকারিতা।

  • হজম শক্তি বাড়ায়

লেবুর রস শরীর থেকে টক্সিন দূর করে। বদহজম, বুক জ্বালার সমস্যাও সমাধান করে লেবু পানি।

  • ক্ষত সারায়

লেবুর মধ্যে থাকা অ্যাবসরবিক অ্যাসিড ক্ষতস্থান দ্রুত সারাতে সাহায্য করে। হাড়, তরুনাস্থি ও টিস্যুর স্বাস্থ্যা ভাল রাখে।

  • পেট পরিষ্কার রাখে

শরীর থেকে অপ্রয়োজনীয়, ক্ষতিকারক পদার্থ বের করতে সাহায্য করে লেবু পানি। ফলে ইউরিনেশন ভাল হয়। লিভার ভাল থাকে।

  • রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়

লেবুর মধ্যে থাকা প্রচুর পরিমাণ ভিটামিন সি সর্দি-কাশির সমস্যা দূর করতে অব্যর্থ। স্নায়ু ও মস্তিষ্কের ক্ষমতা বাড়ায়। ফুসফুস পরিষ্কার করে হাঁপানি সমস্যার উপশম করে।

  • ত্বক দাগ মুক্ত রাখে

লেবুতে থাকা ভিটামিন সি ও অন্যান্য অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট ত্বকের বলিরেখা দূর করতে সাহায্য করে। ব্যাকটেরিয়া রুখে অ্যাকনে সমস্যার সমাধান করে। রক্ত পরিষ্কার রেখে ত্বকের দাগ ছোপ দূরে রাখে।

  • এনার্জি বাড়িয়ে মুড ভাল রাখে

লেবু খেলে শরীরে পজিটিভ এনার্জি বাড়ে। উত্কণ্ঠা ও অবসাদ দূরে রেখে মুড ভাল রাখতে সাহায্য করে লেবু।

  • পিএইচ ব্যালান্স

লেবু শরীরের পিএইচ ব্যালান্স সঠিক রাখতে সাহায্য করে। লেবুর মধ্যে থাকা সাইট্রিক অ্যাসিড মেটাবলিজমের পর ক্ষার হিসেবে কাজ করে। ফলে রক্তের পিএইচ ব্যালান্স বজায় থাকে।

  • শ্বাস- প্রশ্বাস ভাল রাখে

লেবু ফুসফুস পরিষ্কার রাখার ফলে শ্বাস-প্রশ্বাস তাজা রাখে। খাওয়ার পর লেবু পানি দিয়ে মুখ ধুলে ব্যাকটেরিয়া দূর হয়।

  • লিম্ফ সিস্টেম

গরম পানিতে লেবু দিয়ে খেলে শরীর হাইড্রেটেড থাকে। শরীরে ফ্লুইডের সঠিক মাত্রা বজায় রেখে কোষ্ঠকাঠিন্য, ক্লান্তি, রক্তচাপজনিত সমস্যা দূরে রাখে। ঘুম ভাল হয়।

লেবু পাতার গুণাগুণ

লেবুর গুণের কথা আমরা কম বেশি সবাই জানি, তবে এটি কি জানেন? এর পাতায় রয়েছে অসাধারণ কিছু গুণাগুণ, যা আপনার শরীরকে সুস্থ রাখতে বিশেষভাবে সাহায্য করে। চলুন জেনে নেয়া যাক লেবু পাতার অসাধারণ গুণাগুণ সম্পর্কে-

  • ওজন নিয়ন্ত্রণে লেবুও যেমন কার্যকরী, এর পাতাও তেমন। লেবু পাতার রস খেলেও ওজন অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়।
  • দাঁতে কালচে ছোপ পড়েছে? দাঁতকে ঝকঝকে সাদা করে তুলতে চান, তাহলে অবশ্যই লেবু পাতা হতে পারে আপনার এই সমস্যার সমাধান। কয়েকটি লেবু পাতার সঙ্গে পরিমাণ মতো বেকিং সোডা মিশিয়ে একটি পেস্ট তৈরি করুন। এরপর সেই পেস্ট দিয়ে দাঁত মাজুন। মাত্র এক সপ্তাহ এটি করতে পারলেই এই সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে পারেন।
  • সারাদিন কাজের পর বা অতিরিক্ত গরমের জেরে শরীরে ক্লান্তি অনুভব হতে পারে। লেবু পাতার সঙ্গে মধু মিশিয়ে শরবত বানিয়ে খেতে পারেন। এতে শরীরের সমস্ত ক্লান্তি দূর করা সম্ভব।

গরম পানির সঙ্গে লেবু খাওয়ার ক্ষতি

ওজন কমাতে সহজ উপায় হওয়ায় কুসুম গরম পানির সঙ্গে লেবুর রস মিশিয়ে অনেকে পান করেন। এটা সময় কম এবং তুলনামূলক সহজ পদ্ধতি হওয়ায় অনেকেই এই পদ্ধতিকে বেছে নিয়েছেন। এটাতে চর্বি কমে ভালো কথা। তবে সব ভালোর যেমন খারাপ আছে। এই পদ্ধতিরও কিছু খারাপ দিক আছে। জেনে নিন খারাপ দিকগুলো। আর নিজেই সিদ্ধান্ত নিন পদ্ধতিটি আর কাজে লাগাবেন কিনা।

  • গরম পানিতে লেবুর রস দেওয়া মাত্র এর ভিটামিন সি নষ্ট হয়ে যায়। ফলে আপনার শরীরে কোনও প্রকার ভিটামিন প্রবেশ করছে না
  • গরম পানিতে সাইট্রিক অ্যাসিডের কার্যক্ষমতা ভীষণ বাড়ে ফলে এসিডিটি বেড়ে যেতে পারে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বেড়ে যায়।
  • দাঁতের এনামেলের মারাত্মক ক্ষতি হয়। এমনিতে লেবু খেলে দাঁত টক হয়ে যাওয়ার অনুভূতি সবার কাছে পরিচিত। এটিই এনামেলের ওপর আঘাত হানে। আর গরম পানির সঙ্গে সাইট্রিক এসিড আরও ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ফলে খুব দ্রুত দাঁত নষ্ট হতে থাকে।
  • আবার স্থূলকায় হওয়ার পরও যাদের ব্লাড প্রেসার লো, তাদের প্রেসার আরও লো করে দেয় এই লেবু গরম পানি।
  • লেবু গরম পানির সাথে খাওয়ার পর পেট ভরে খাবার না খেলে পেটে ব্যথা শুরু হতে পারে।

অতিরিক্ত লেবুর রস সেবনের অপকারিতা

  • দাঁতের এনামেল ক্ষয়ে যায়

লেবু আমাদের নানা রকম উপকারে আসে. তবে অতিরিক্ত খেলে লেবুর মধ্যে থাকা সাইট্রিক অ্যাসিড থেকে দাঁত ক্ষয়ে যাওয়ার মতো সমস্যা দেখা যায়. দাঁতের উপর সাদা স্তর পড়ে যায়. সম্প্রতি ব্রাজিলের National Institute of Dental and Craniofacial Research এর একটি গবেষণা পত্রে বলা হয়েছে সফট ড্রিংক খেলে দাঁতের যে সমস্যা হয় লেবুর থেকেও ঠিক একই সমস্যা হয়। এছাড়াও যারা প্রতিদিন সকালে উঠে লেবু জল খান তাঁরা যদি দিনে অন্তত দুবার ব্রাশ করেন তাহলে দাঁতের সমস্যা অনেক কম হয়।

  • মুখমন্ডলের কোশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়

দীর্ঘদিন ধরে লেবু খেলে মুখের মধ্যে থাকা নরম কোশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সেখান থেকে মুখের মধ্যে ফোঁড়া বা ফুসকুড়ি হওয়ার সম্ভাবনা রয়ে যায়। সাইট্রিক অ্যাসিড সমৃদ্ধ যে কোনও ফল খেলেই এই সমস্যা হতে পারে।

  • উৎসেচক ভেঙে যায়

খালি পেটে লেবু খেলে আমাদের শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় উৎসেচক পেপসিন ভেঙে যায়। পেপসিন আমাদের হজমে সাহায্য করে। পেপসিন মূলত প্রোটিন হজম করায়। এদিকে লেবুর মধ্যে থাকা সাইট্রিক অ্যাসিড পেপসিন কে ভেঙে ক্ষতিকর এনজাইম তৈরি করে। ফলে খাবার ঠিকমতো হজম হয় না। এমনকি পেপটিক আলসারের সম্ভাবনা থেকে যায়। যে কোনও আ্যাসিড সমৃদ্ধ ফল খেলেই এই সসম্ভাবনা থাকে।

  • অ্যাসিড এবং বমির সম্ভাবনা থাকে

ভিটামিন সি শরীরের জন্য প্রয়োজন। কিন্তু অতিরিক্তও ভালো নয়। অতিরিক্ত লেবু বা লেবুর রস খেলে সেখান থেকে অ্যাসিড তো হবেই। সেই সঙ্গে বমি বমি ভাব বা বমি হতেই পারে। যেখান থেকে পরবর্তীকালে গুরুতর সমস্যা দেখা দেয়। শুধুমাত্র লেবু জল নয়। যে কোনও ডিটক্স ডায়েট ড্রিংক থেকেই এই সমস্যা হতে পারে।

  • বারবার বাথরুম পাওয়া, শরীর শুকনো হয়ে যাওয়ার মতো সমস্যা দেখা যায়

গরম জলে লেবু যেহেতু ডিটক্সিফিকেশনে সাহায্য করে তাই বারে বারে বাথরুমে যাওয়ার প্রয়োজন হয়। এছাড়াও পেট ফেঁপে যাওয়া, শরীর শুকনো হয়ে যাওয়ার মতো সমস্যা দেখা দেয়। বারবার প্রস্রাব হওয়ার ফলে ইলেকট্রোলাইটস ও সোডিয়াম দেহের থেকে বেরিয়ে যায়। আর এই বার বার বাথরুমে যাওয়ার ফলে ব্লাডারে চাপ পড়ে। যা কিন্তু শরীরের জন্য ক্ষতিকর। এছাড়াও পটাসিয়ামের অভাব দেখা যায়। এক সপ্তাহ লেবু বা সাইট্রিক জাতীয় ফল খাওয়া বন্ধ রাখুন। তাহলেই পার্থক্য বুঝতে পারবেন।

  • আয়রনের মাত্রা বাড়ায়

অতিরিক্ত ভিটামিন সি রক্তে আয়রনের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। আয়রন প্রয়োজন, কিন্তু পরিমাণ বেশি হলে তা ক্ষতিকর। যার ফলে অভ্যন্তরীন অঙ্গ প্রত্যঙ্গের ক্ষতি হয়।

  • মাইগ্রেন বাড়ায়

সাইট্রাস মাইগ্রেন বাড়ায়। যাদের মাইগ্রেনের সমস্যা রয়েছে তাদের এমনিই লেবু জাতীয় ফল না খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।

  • ত্বকের নানারকম সমস্যা দেখা যায়

লেবুতে অনেকের অ্যালার্জি আছে। অনেকেই তা বুঝতে পারেন না। লেবু খেয়ে রোদে বেরোলে স্কিনে লাল র‌্যাশ দেখা যায়। কিছু ক্ষেত্রে কালো ছোপও দেখা দেয়। যাকে আমরা সানবার্ন বলে ভুল করি। ডাক্তারি পরিভাষায় একে সাইটোফোটোডার্মাটাইটিস বলা হয়। লেবুর মধ্যে থাকা সাইট্রিক অ্যাসিডের সঙ্গে সূর্যালোকের বিক্রিয়ায় এই সমস্যা দেখা যায়। এছাড়াও অতিরিক্ত লেবুর রস স্কিন ক্যানসার ডেকে আনে।

জেনে রাখুন

প্রতিদিন কোনও গুরুত্বপূর্ণ ওষুধ খেলে লেবু বা সাইট্রিক জাতীয় ফল এড়িয়ে যাওয়াই ভালো।
এছাড়াও ক্যালসিয়ামের ওষুধ খেলে সঙ্গে লেবু খাবেন না। এতে হিতে বিপরীত হবে।‌ সম্প্রতি জাপানের একটি সমীক্ষা বলছে, ওষুধ চলাকালীন ফলের জুস এড়িয়ে যেতে পারলে সবচেয়ে ভালো হয়।

প্রতিদিন কতটা খেতে পারেন
প্রতিদিন ১২০ মিলি লিটার পর্যন্ত লেবুর রস খেতে পারেন। অর্থাৎ প্রতিদিন ফলের রস এবং লেবু রস মিলিয়ে ১২০ মিলি লিটারের বেশি খাওয়া শরীরের পক্ষে ক্ষতিকর। তবে গর্ভবতী দের ক্ষেত্রে এবং যাদের দুগ্ধ জাতীয় খাবারে সমস্যা রয়েছে তাঁরা ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া লেবুর রস বা খালি পেটে গরম জলে লেবু খাবেন না।

Leave a Reply

ইনস্টাগ্রাম থেকে আয় করবেন যেভাবে

গরুর গোশত কার জন্য কতোটুকু খাওয়া নিরাপদ?