in , , , ,

লিভার সিরোসিস কি? কেন হয় এবং প্রতিকার ও চিকিৎসা কি?

লিভার শরীরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এবং সর্ববৃহৎ অঙ্গ। শরীরকে সুস্থ রাখতে প্রয়োজন সুস্থ লিভার। লিভারকে বলা হয় শরীরের পাওয়ার হাউজ যা জীবন ধারনের জন্য অপরিহার্য। তাই লিভারের অসুস্থতার ফলাফল ক্ষেত্র বিশেষে হতে পারে ব্যাপক ও ভয়াবহ।

লিভারের রোগঃ

• লিভার নানা ধরনের রোগে আক্রান্ত হতে পারে। কিছু রোগ বংশগত , কিছু একোয়ার্ড বা অর্জিত, কিছু রোগ স্বল্পস্থায়ী যা চিকিৎসায় পুরোপুরি ভাল হয়ে যায়, কিছু রোগ দীর্ঘস্থায়ী, যা চিকিৎসা সত্ত্বেও ক্রমাগত জটিল থেকে জটিলতর হয়ে নিঃশেষ করে দেয় জীবন। হেপাটাইটিস বা লিভারে প্রদাহ বিশ্ব জুড়ে লিভারের প্রধান রোগ। নানা কারনে এই প্রদাহ হতে পারে। যার অন্যতম কারণ এ,বি,সি,ডি,ই, নামক হেপাটাইটিস ভাইরাস। জল ও খাবারের মাধ্যমে সংক্রমিত হেপাটাইটিস এ ও ই ভাইরাস লিভারে একিউট হেপাটাইটিস বা স্বল্প স্থায়ী প্রদাহ সৃষ্টি করে যা অধিকাংশ ক্ষেত্রে পুরোপুরি সেরে যায়। দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহের জন্য দায়ী হেপাটাইটিস বি, সি ও ডি ভাইরাস। অনেক কারনেই লিভারের প্রদাহ হতে পারে। লিভারের

• এছাড়াও দীর্ঘস্থায়ী বা ক্রনিক হেপাটাইটিস বছরের পর বছর চলতে থাকলে লিভারের কোষগুলো মরে যায়। অকার্যকর ও অপ্রয়োজনীয় ফাইব্রাস টিসু সে স্থান দখল করে জন্ম দেয় সিরোসিস নামক মারাত্মক রোগ। লিভার সিরোসিসের ফলে লিভার তার স্বাভাবিক কর্মক্ষমতা পুরোপুরি হারিয়ে ফেলে। এটা একদিনে হয় না। লিভারের সমস্যা থেকে ধীরে ধীরে তা সিরোসিসের রূপ নেয়। অনেক ক্ষেত্রেই লিভার সিরোসিসে আক্রান্ত রোগী লিভারের ক্যান্সারে আক্রান্ত হন। এটা থেকে মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। লিভার সিরোসিসের কোনো চিকিৎসা নেই। এ কারণে প্রতিরোধই পারে এ রোগে মৃত্যুর সম্ভাবনা কমাতে। প্রাথমিক পর্যায়ে লিভার সিরোসিসে আক্রান্ত ব্যক্তির মধ্যে তেমন কোনও লক্ষণ দেখা যায় না। সমস্যা শুরু হয় যখন রোগটি মারাত্মক পর্যায়ে পৌঁছে যায়।

লিভার সিরোসিস এর লক্ষণঃ

প্রাথমিক পর্যায়

  • দুর্বলতা অনুভব করা
  • সহজেই ক্লান্ত হয়ে পড়া
  • দাঁতের মাড়ি বা নাক থেকে রক্ত পড়া
  • পেটের ডান পাশে ব্যথা হওয়া
  • জ্বর জ্বর ভাব
  • ঘন ঘন পেট খারাপ হওয়া

মধ্যম পর্যায়

  1. পায়ে-পেটে জল চলে আসা
  2. জন্ডিস হওয়া এবং রোগী জ্ঞানও হারাতে পারেন
  3. রক্তবমি ও পায়খানার সঙ্গে রক্ত যাওয়া

মারাত্মক পর্যায়

  1. ফুসফুসে জল আসা
  2. কিডনি ফেইলিউর বা কিডনির কার্যক্ষমতা হারানো
  3. শরীরের যেকোনো জায়গা থেকে অতিরিক্ত ও নিয়ন্ত্রণবিহীন রক্তপাত।

লিভার সিরোসিস এর কারণঃ

সিরোসিসের কারণগুলো বিভিন্ন হতে পারে। লিভার সিরোসিসের অন্যতম প্রধান কারণ হেপাটাইটিস বি ভাইরাস, আর এর পরেই রয়েছে ফ্যাটি লিভার। ফ্যাটি লিভার নানা কারণে হয়ে থাকে। যেমনঃ

  • ডায়াবেটিস,
  • রক্তে চর্বি বেশি থাকা,
  • অতিরিক্ত ওজন,
  • উচ্চরক্তচাপ ,
  • হাইপোথাইরয়েডিজম ইত্যাদি।

এক গবেষণায় জানা যায়, ফ্যাটি লিভারে আক্রান্ত প্রায় ৩০ শতাংশ রোগী পরে লিভার সিরোসিসে আক্রান্ত হয়।লিভার সিরোসিসের আরেকটি মারাত্মক কমপ্লিকেশন হলো হেপাটিক এনসেফালোপ্যাথি বা হেপাটিক কোমা। সহজ কথায় বলতে গেলে, অপ্সান হয়ে যাওয়া।

প্রাণিজ আমিষ যেমন মাছ-মাংস, ডিম-দুধ ইত্যাদি খুব বেশি পরিমাণে খেলে রক্তে অ্যামোনিয়ার পরিমাণ বেড়ে গিয়ে রোগীর অপ্সান হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। তাই ডিকম্পেনসেটেড বা এডভান্সড লিভার সিরোসিসের রোগীদের এ ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে। তাই বলে অতিরিক্ত সতর্ক হতে গিয়ে প্রাণীজ আমিষ একেবারেই বাদ দিলে চলবে না। সেক্ষেত্রে রক্তে ক্রিয়েটিনিনের মাত্রা বেড়ে যেয়ে কিডনি ফেইলিওর হতে পারে। বিশেষ করে যেহেতু এ ধরনের রোগীদের কিডনি এমনিতেই নাজুক অবস্থায় থাকে এবং তারা হেপাটোরেনাল সিনড্রোম নামক মারাত্মক ধরনের কিডনি ফেইলিওরের ঝুঁকিতে থাকেন।

লিভার সিরোসিস প্রতিরোধে করণীয়ঃ

  1. অতিরিক্ত অ্যালকোহল পান লিভার সিরোসিসের অন্যতম কারণ। সাধারণত ১০ বছর বা তার বেশি সময় ধরে অতিরিক্ত অ্যালকোহল পান করলে লিভার সিরোসিসের ঝুঁকি থাকে।
  2. লিভারে প্রদাহ সিরোসিসের আরেকটি কারণ। সাধারণত এ,বি, সি ভাইরাসের আক্রমন করলে লিভার সিরেসিস হতে পারে।এগুলো রক্তদান বা গ্রহণের সময় শরীরে প্রবেশ করতে পারে। এ কারণে রক্ত দেওয় বা নেওয়ার আগে রক্ত পরীক্ষা করা উচিত। সেই সঙ্গে এসব ভাইরাসের প্রতিষেধক টিকা দিতে পারেন।
  3. মসলাদার, জাঙ্কফুড, প্রক্রিয়াজাত খাওয়া এড়িয়ে চলুন।
  4. রাস্তাঘাটে সহজপ্রাপ্য খাবার না খাওয়াই ভাল। বরং দৈনিক খাদ্য তালিকায় বেশি করে শাকসবজি রাখুন এবং কম তেলযুক্ত খাবার খান।
  5. গবেষণায় দেখা গেছে, যারা দিনে ২ থেকে ৩ বার কফি খান তাদের লিভার সিরোসিসের ঝুঁকি অন্যান্যদের তুলনায় কম থাকে।
  6. কাঁচা পেঁয়াজ ও রসুন শরীরের টক্সিনকে বের করতে সাহায্য করে। তাই প্রতি দিন খাদ্য তালিকায় কিছুটা কাঁচা পেঁয়াজ ও রসুন রাখুন।
  7. শরীরের কোথাও ব্যথা বাড়লেই তা সহ্য না করে যখন তখন ব্যথানাশক ওষুধ খাওয়ার অভ্যাস থাকলে তা লিভারের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকারক। ব্যথানাশক ওষুধে ব্যবহৃত নানা উপাদান লিভারের কার্যক্ষমতা নষ্ট করে লিভারের ক্ষতি করে।
  8. পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি পান করুন।
  9. কেউ হেপাটাইসিস বি বা সি তে আক্রান্ত হলে স্ক্রিনিং করুন। লিভার সিরোসিস প্রাথমিক পর্যায়ে থাকলে তা অনেকক্ষেত্রে নিরাময় করা সম্ভব।

লিভার সিরোসিসের চিকিৎসাঃ

  • লিভার সিরোসিসে আক্রান্ত যেকোনো ব্যক্তির উচিত দ্রুত লিভার বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হয়ে চিকিৎসা নেওয়া ও নিয়মিত ফলোআপে থাকা। এতে দীর্ঘদিন সুস্থ থাকা যায়। এছাড়াও লিভার সিরোসিসের কারণ শনাক্ত করে চিকিৎসা করা গেলে লিভার সিরোসিসের জটিলতার দিকে যাওয়ার ঝুঁকিও অনেক কমে যায়। লিভার সিরোসিসের আধুনিক চিকিৎসা আজ এ দেশেই সম্ভব। তবে লিভার ট্রান্সপ্লান্টেশনের ব্যবস্থা এদেশে এখনও সেরকম নাই। প্রতিবেশী দেশে এ সুযোগ থাকলেও তা খুব ব্যয়বহুল আর সংগত কারণেই আমাদের দেশের অধিকাংশ রোগীর পক্ষে তা সাধ্যের অতীত। তবে আমরা আশাবাদী সেদিন হয়তো আর বেশি দূরে নয়, যেদিন আমাদের দেশেই অনেক সাশ্রয়ী মূল্যে এ দেশের লিভার ট্রান্সপ্লান্টেশন সম্ভব হবে।

লিভারের রোগ মানেই সব কিছু শেষ হয়ে যাওয়া নয়। সঠিক সময়ে সঠিক চিকিৎসার মাধ্যমে অনেক ক্ষেত্রেই সম্পূর্ন নিরাময় এবং জটিলতা মুক্ত থেকে মোটামুটি স্বাভাবিক ভাবে জীবন নির্বাহ করা যায়। তাই এব্যাপারে সবার সচেতনতা অত্যন্ত জরুরী।

শেষ কথাঃ

  • রাজনীতির মতো লিভার সিরোসিসেও শেষ কথা বলে কিছু নেই। প্রয়োজন প্রাথমিক পর্যায়ে সিরোসিসের রোগীকে শনাক্ত করে সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করা। যেহেতু আর্লি সিরোসিসে তেমন কোন লক্ষণ থাকে না বললেই চলে, তাই রোগী আর চিকিৎসক উভয়ের সচেতনতাটা এক্ষেত্রে খুবই জরুরী।

Leave a Reply

হযরত শব্দের অর্থ

আঁচিল কি? কেন হয়? ঘরোয়া উপায়ে আঁচিল দূর করার পদ্ধতি